পিতা’র শান্তি শয়ানের দিনটি!

পিতা’র শান্তি শয়ানের দিনটি!

ভাইবোনদের সবাইকে নিয়ে আব্বা আম্মা ক’দিনের জন্য দাদীর বাড়ীতে গিয়েছেন। সেদিন বাসায় আমি একা। তখনকার দিনে আমাদের মফস্বল শহরটিতে বড়দের মান্য করার চলটা খুব ছিলো। কলেজ মাঠে পাড়ার বড়ভাইরা খেলাধুলা করে, মোড়ের দোকানে দিনভর মুরুব্বিরা গল্পে মশগুল, স্টেডিয়ামের গেট তালাবন্ধ, চৌরঙ্গীতে দাঁড়ালে বড়রা ধমকায়, গার্লস স্কুলের মোড়ে গেলে মেয়েরা হ্যাংলা ভাবে, পোষ্ট অফিসের বারান্দায় বসে সিগারেট খেলেও বাসায় গাঁজা টানার নালিশ আসে! ছোট্ট সেই শহরটিতে বয়ঃসন্ধিকালে আমাদের দুণ্ড বসবার কোন জায়গা ছিলো না। এমন বাস্তবতায় ক’দিনের জন্য একটি ‘ফাঁকা বাসা’ পাওয়া তো জীবনে প্রথম প্রেমপত্র হাতে পাওয়ার মতোই তীব্র আনন্দের।

১৯৮০ সালের ১৮ই মে, দিনটির কথা বলছি। সেদিন সকাল সকালই বন্ধুরা ক’জন আমাদের বাসায় চলে এলো। কেউ বসেছে দাবার খোট নিয়ে, হারমোনিয়ামের বেসুরো রিডগুলো সুরে ফেরাচ্ছে কেউ, পেয়ারা গাছ তলায় টেবিল পেতে দুজন কেরামবোর্ড খেলায় ব্যস্ত, উল্টোদিকের বাসার দুই সুন্দরী বিউটি আর বেবী ওদের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো কিনা, তা দেখার দায়িত্বে দুজন। সিগারেট ধরেছি বলে ক’মাস হল বন্ধুসভায় আমার অবস্থান বেশ পোক্ত হয়েছে। সোফার উপরে বসে টি-টেবিলে পা তুলে সিগারেট ফুঁকছি। এটা আব্বার স্টাইল। আব্বার মতো আয়েস করে বসে সিগারেট টানবো; বহুদিন থেকেই এই সুযোগটুকুর অপেক্ষায় ছিলাম।

শুধু সিগারেট টানার স্টাইলের কথাই বা বলছি কেন? আব্বা কেমনে হাঁটেন, কেমনে বসেন, কোন কাইতে ঘুমান, রেগে গেলে ইংরেজী বলতে থাকেন, হাসবার পরিমিতি, বলেন কম শোনেন বেশি, পড়ার অভ্যাস, কোচ দিয়ে কুপিয়ে মাছ ধরার নেশা, তাঁর স্বল্পাহার, পরিচ্ছন্ন পোশাক, ইত্যাদি সবই তো অনুকরণের চেষ্টা করছি আজো। মনে পড়ে, আব্বা যখন দাদী বাড়ীর তল্লাটে রাস্তাঘাটে বেরুতেন বা শালিসি বৈঠকে বসতেন তখন খানিক বাদে বাদেই তাঁকে বলতে হতো, “ওয়ালাইকুম আসসালাম”। সারাজীবন চেষ্টা করেও তাঁর কোন গুণই তো আয়ত্ত করতে পারলাম না। তাই বোধ হয় আমাকে “আসসালামু আলাইকুম” বলে বলেই জীবন কাটাতে হচ্ছে।

তো বলছিলাম সেই দিনটির কথা। বন্ধুদের সাথে সুখোসময় বেশ এগুচ্ছিলো। এমন সময় জানালা দিয়ে দেখি বাসার গেট ঠেলে সাইকেল নিয়ে মনিরুল ঢুকছে। ও আমাদের গাঁয়ের সব থেকে নম্র ছেলেটি, আমার এক ক্লাস নিচে পড়ে। আমাকে সে মামা ডাকে, আর আমি ওর নাম ধরে। দাদীবাড়ীর এলাকা থেকে প্রতিদিনই নানান কাজে আব্বার কাছে লোক আসে। বসার ঘরখানি সব সময় গিজগিজ করে। মনিরুলও অনেকবার এসেছে। বাসায় ওর এই ‘আসাটা’ স্বাভাবিক ঘটনা। তবে তার সাথের সাইকেলখানা দেখে আমার বিস্ময়ের শেষ নেই। দাদী বাড়ীতে দুখানা সাইকেল, একখানা সবাই চালায়; আরেকখানা কেবলমাত্র ছোটকাকার বাহন। আব্বা তাঁর কলিজার টুকরা ছোটভাইকে ফনিক্স ব্রান্ডের ওই সাইকেলখানা ম্যালা টাকা খরচ করে কিনে দিয়েছেন। চালানো তো দূরের কথা, সে সাইকেলের দিকে আমরা কেউ তাকালেও খবর আছে।

ছোটকাকা তাঁর যতনের ধন এই সাইকেলখানাকে পরিষ্কার ত্যানা দিয়ে দিনে অন্তত ৪ বার মোছেন। একটা মাছি এসে বসলেও সারা বাড়ী তাড়া করে পোকাটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে তবেই তাঁর শান্তি। সাইকেলখানা সারাক্ষণ তালা দেওয়া, কাউকেই ছুঁতে দেন না। আর মনিরুল কিনা সেই সাইকেল চালিয়ে গোপালগঞ্জ এসেছে। অবিশ্বাস্য ঘটনা? নিশ্চয়ই কোথাও মস্ত কোন একটা ক্যাচাল ঘটেছে! সিগারেট ফেলে দিয়ে বাইরে বেরিয়েই আমার বিস্মিত জিজ্ঞাসা,

-হ্যারে মনিরুল ছোটকাকা তোরে সাইকেল দিলো?

থরথর করে কাঁপছে সে! কথা বেরুচ্ছে না তার মুখ দিয়ে! যেটুকু বা বেরুচ্ছে তাও আউড়ে যাচ্ছে। খানিক চেষ্টার পরে বলল,

-মামা ভাইজান খুব অসুস্থ, আপনি এক্ষণি বাড়ী চলেন।

মনিরুলের চিবুক ধরে সজোরে ঝাঁকি দিয়ে বললাম,

-কি হইছে আব্বার? সত্যি কইরা ক’তো? তেমন বড়সড় দুর্ঘটনা না ঘটলি ছোটকাকা তো তোরে সাইকেল দেয়া মানুষ না!

-মামা কথা বাড়াইয়েন না তো, ঘরে তালা দেন, আর শিগগির রওনা হন। ভাইজান ভারি কাবু, আপনারে দেখতে চাইছে।

-তুই এ রকম কাঁপতিছিস ক্যান, চোখে পানি ক্যান তোর? সত্যি ক’তো আব্বার কি হইছে?

মাথা নিচু করে রইলো মনিরুল, আর বন্ধুরা অনেকটা যেন সামরিক কায়দায় ঘিরে ধরল আমাকে। বাবা অসুস্থ হলে ছেলের কর্তব্য কি, তাতো আমি বুঝি না। আমি তো অত বড় না, ক’দিন আগে মাত্র মেট্রিক পাশ করেছি। পরিবারের যে কোন আনন্দে সব থেকে বড় লম্ফটা আমিই দেই বটে, কিন্তু আপদকালীন কর্তব্যতো এখনও কিছু শিখি নি! বন্ধুদের হাবভাবে বেশ বুঝতে পারছি যে, প্রলয়ঙ্করী কোন একটা কিছু ওরা আমার কাছে লুকচ্ছে। অজানা কোন ভয়ঙ্কর বার্তা যেন আমার ইন্দ্রিয়গুলো একে একে অবশ করে দিচ্ছে। তবুও “ভাইজান অসুস্থ” মনিরুলের এই কথাটিই অবুঝ মন আঁকড়ে ধরলো।

বেলা ১টার ফিরতি লঞ্চখানা ধরবো বলে তড়িঘড়ি লঞ্চঘাটা পৌঁছুলাম। বিকাল ৫টা নাগাদ সোনাডাঙ্গা ঘাটে লঞ্চ পৌঁছাবে, সেখান থেকে আধাঘন্টার হাঁটা পথ পেরিয়ে তবেই দাদীর বাড়ী। গতরাতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনাটি ততক্ষণে লোকমুখে সারা অঞ্চলে ছড়িয়েছে। সবাই সত্যটি জানে, কিন্তু আমাকে বলছে না কেউ। লঞ্চঘাটে পৌঁছে দেখি বন্ধুরা ক’জন আমার আগেই সেখানটায় উপস্থিত। রিক্সা থেকে নামতে নামতে জিজ্ঞাসা করলাম,

-কিরে, তোরা এখানে কেন?

কেউ একজন বললো, আমরাও যাবো তোর সাথে।

-তার মানে কি? তোরা কেন যাবি? কোনদিন তো যাস না?

আমার সমগ্র চেতনা যেন অসাড় হয়ে আসছে। অনেকটা বেসামাল হয়ে বললাম,

-সত্যি ক’তো তোরা, আমার আব্বা নাই, তাই নারে?

খুব জোরের সাথে ওদের একজন বললো,

-ধুর বোকা কি কচ্ছিস এ সব, কাকা অসুস্থ তাই আমরা দেখতে যাচ্ছি। আর কথা কইস না, লঞ্চে উইঠা পড়।

ঘাটেবাঁধা লঞ্চে যাত্রী উঠানামার জন্য পুরু কাঠের সিঁড়ি লাগানো। আমি সিঁড়ির গোঁড়ায় পৌঁছুতেই লঞ্চের সারেং গনিকাকা এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে তুলে নিলো। শতবার তার লঞ্চে যাওয়া আশা করেছি। এমনটি তো কখনও করে না সে। আজ কেন তবে আমার জন্য এমন বিশেষ যত্ন? মনের খটকা আরো বাড়লো। নিয়ে বসালো সারেং ক্যাবিনে, তার পাশেই। ঘাট ছেড়ে চলমান লঞ্চের নিয়ন্ত্রণ সংহত করেই গনিকাকা স্বগতোক্তি করে বলে চলেছেন,

-তোর আব্বার তদবিরে আমি এই লঞ্চ কম্পানিতে চাকরী পাইছিলাম, গত বছর নিজি দাঁড়ায় থাইকা আমারে বিয়া দিছে, অহনও ভাইজান আমার কাছে ৮০ডা ট্যাকা পায়!

এটুকু বলে মানুষটি ঘাড়ের গামছায় চোখ মুছল। আমি শান্তভাবে তার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করলাম,

-কাকা আব্বা মইরা গ্যাছে তাইনা?

একহাতে লঞ্চের স্টিয়ারিং ধরে আরেক হাত আমার মাথায় ডলে দিয়ে বললো,

-আউ অমন কথা মুখি আনিস না বাজান। তুই বাড়ী যা, ভাইজান অসুস্থ!

বসে আছি সারেংয়ের ক্যাবিনে, চলছে লঞ্চ। বন্ধুরা কেউ আমার কাছে ঘেঁষছে না। ডেকের সামনের দিকের রেলিংয়ের দুপাশে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে ওরা। বেশ বুঝতে পারছি, আমার দিকে সজাগ দৃষ্টি ওদের। গনিকাকা লঞ্চের ইঞ্জিনম্যানকে ডেকে পাঠিয়ে বললো,

-ওই বরকইত্যা আইজ ফুলস্পীডে ইঞ্জিন চালাবি, ত্যাল বেশি খায় খাক। বড় ভাইজান অসুস্থ, বাজানরে তাড়াতাড়ি পৌঁছাতি হবি, বুঝছোস।

মাথা নেড়ে বরকত ইঞ্জিনের গতি বাড়াতে গেল।

খানিক বাদেই টিক্কা চা নিয়ে হাজির। পিরিচের উপরে দুখানা লাল ফোটা দেওয়া বিস্কুটও দিয়েছে। বললাম,

-কিরে তুই চা আনছিস ক্যান? আমি তো চাই নাই?

-ভাইজান খান, আপনার জন্যি স্পেশাল বানাইছি।

টিক্কা এই লঞ্চে চায়ের দোকান চালায়। ও আমাদের নিকটাত্মীয় বালা কাকার ছেলে। এ পথে যাতায়াতের সময়ে কতবারই তো টিক্কার দোকনের চা খেয়েছি। তবে না চাইতে সে কখনওই চা নিয়ে আসেনি। চায়ের কাপ-পিরিচ হাতে নিতে নিতে জিজ্ঞাসা করলাম,

-হ্যারে টিক্কা খবর কিছু জানিস নাকি? আব্বা কি বাইচা আছে?

-নাউজবিল্লাহ্ ভাইজান এইডা কি ক’ন? বড়কাকা ইট্টু অসুস্থ, আপনি বাড়ীত যান।

সেদিন সবাই যেন আমার সাথে মিথ্যা বলবার পণ করেছিলো। আমার প্রতি সকলের মনোযোগের বাড়াবাড়িতে চিন্তা শক্তি যেন বিধ্বস্ত হয়ে এলো। দ্রুত চলবার কারণে লঞ্চখানা আধাঘণ্টা আগেই সোনাডাঙ্গা ঘাটে পৌঁছালো। বন্ধুদের নিয়ে নেমে পড়লাম। গনিকাকা খালের পাড় অব্ধি নেমে এলো, বললো বাজান তুই যা, আমি গোয়লগাঁ ঘাটে লঞ্চ নোঙ্গর কইরা রাইতে তগো বাড়ী আমুনে। রাস্তা দিয়ে বাড়ীমুখি হাঁটছি আমরা, তবে কেউই কারো সাথে কথা বলছি না।

মামুদপুর গ্রামটা পেরুলেই আমাদের গাঁ। এ রাস্তার দুপাশের বাড়ীঘর আমার অনেক চেনা। এখানকার মানুষদের কাছে আমি অত্যন্ত স্নেহের পাত্র, আর ওরা আমাদের আপনারজন। দূর থেকে দেখে চিত্তকাকু ক্ষেত মাড়ায়ে এগিয়ে এলেন। রাস্তায় উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। বললেন,

-খানিক আগেই তগো বাড়ী থেইক্যা ফিরলাম।

নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, আমার আব্বার সাথে দেখা হইছে কাকু?

বন্ধুদের মধ্যে কেউ হয়তো তাকে ইশারা করে থাকবে। ঢোক গিলে বললেন,

-চেয়ারম্যান দাদা ঘুমাচ্ছিলো, কথা হয় নাই। চল তোর সাথে আবার যাই, দেখা কইরা আসি।

আরো খানিক এগুতেই সহপাঠী বুলিদের বাড়ী থেকে সম্ভুকাকু ডাক ছাড়লেন,

-ছোটবাপ কি এই লঞ্চে আসলি?

-জ্বী কাকু, গলা চড়িয়ে বললাম।

-আইচ্চা বাপ বাড়ীত যা।

এ পথে বহুবার হেঁটেহেঁটে বাড়ীতে ফিরেছি। তবে আজকে একটা ব্যতিক্রম লক্ষ্য করছি। সঙ্গীদের নিয়ে হেঁটে এগুনোর সাথে সাথে প্রত্যেক বাড়ীর মেয়েছেলেরা কাজকর্ম ফেলে বাড়ীর আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে আমাদের যাওয়া দেখছে। যতক্ষণ না আমরা দৃষ্টির আড়াল হই, ততক্ষণই তারা দাঁড়িয়ে। কিন্তু কেন? আরো খানিক এগুতেই প্রিয়লাল কাকুর বৃদ্ধ বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। আমি বললাম,

-কি হয়েছে দাদু, আপনি কাঁদছেন যে?

বিচক্ষণ মানুষ তিনি, মুহূর্তেই বুঝে ফেললেন যে ঘটনা আমি জানি না। বললেন,

-বাড়ী যাও দাদুভাই, সব কিছু তোমার অপেক্ষায় আছে!

মানুষের জীবনে “বাবা থাকা” কতটা জরুরী? সেকি আমরা তাঁকে না হারানো অব্ধি বুঝতে পারি? জন্মাবধি যে পাখি গাছের শক্ত ডালে নিশ্চিন্তে বসে, সে কি করে বৃক্ষহীন মরুতে উড়ন্ত পাক্ষির ডানা ঝাপটানোর ক্লান্তি বুঝবে? হাওড় বিলে সাঁতরে বেড়ানো মৎস্য যদি হঠাৎ কখনও লাফ দিয়ে ডাঙ্গায় গিয়ে পড়ে; তখনই না সে জলের মাহাত্ম্য বুঝতে পারে! কৈশোরের সেই দিনটিতে বাড়ীমুখি পথ চলার প্রতিটি বাঁকে জীবনদায়িত্বের পোটলাগুলো যেন একে একে আমার দুই কাঁধে জমছিল।

শরৎ কাকুর বাড়ীটি পেরোতেই গাঁয়ে ঢুকলাম। লক্ষ্য করলাম, আমাদের হেঁটে এগুনোর সাথে সাথে বাড়ীগুলো থেকে ছেলে বুড়ো এমনকি মহিলারা পর্যন্ত পিছু নিচ্ছে। এরা সবাই আমার চেনা, অথচ আজ অচেনার মতো আচরণ করছে। সাথে হাঁটছে তবু কেউ আমার সাথে কথা বলছে না। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে, কিন্তু কারো দিকে আমি তাকাতেই সে চোখ ফিরিয়ে নেয়। প্রায় সবার চোখই জলে ভেজা, আর মুখে সর্বনাশা কিছু একটা ঘটে যাওয়ার শঙ্কা। আরো কিছুটা এগুতেই দেখলাম লোকে লোকারণ্য! বাড়ীর ভিটা ছাড়িয়ে পালান, খেলার মাঠ, ফসলের ক্ষেত পর্যন্ত শুধু মানুষ আর মানুষ। মনের সংশয় আরো বাড়লো। একজন অসুস্থ মানুষ যদি মুমুর্ষও হয় তবুও তো তাঁকে দেখতে এত লোক সমাগমের কথা না! তবে কি আমার আব্বা সুস্থ/অসুস্থের জাগতিক গণ্ডি অতিক্রম করেছেন?

ডানে বায়ে না তাকিয়ে টানা হেঁটে এগুচ্ছি। বাড়ী সংলগ্ন পাথারে পৌঁছানোর পরে লোকেরা দুপাশে সরে দাঁড়িয়ে আমাকে পথ ছেড়ে দিচ্ছিলেন। এমন পথে হাঁটা অতীব দু:সহ! আমার দিকে সহস্র মানুষের জোড়া জোড়া চোখ। দুপাশ থেকে ফোঁপানো কান্নার শব্দও শুনতে পাচ্ছি। ছোট্ট মিলনটা কোথা থেকে দৌড়ে এসে আমার মাজা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে আর সাথে হাঁটছে। ওর কান্নার হাবভাব ভারি অবুঝের মতো। তবে আরো দুশো কদম এগুতেই “বুঝমান কান্নার” ধ্বনি শুনতে পেলাম। আব্বার প্রধান সেনাপতি, আমার নোয়াকাকা রেন্ট্রি গাছের তলা থেকে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি সেদিন যে আর্তনাদ করেছিলেন, তার অনুরণন আমি আজও শুনতে পাই। তিনি যেন তাঁর সব কষ্টটুকু আটকে রেখেছিলেন আমার কাছে উগরে দিবেন বলে।

সহস্র মানুষের কান্নার আভরণ ভেদ করে অবশেষে বাড়ীর বাইরের উঠানের প্রান্তে পৌঁছুলাম। দেখি দক্ষিণ ঘরের দরজা সংলগ্ন চত্তরে শীতল পাটির উপরে সাদা কাপড় মুড়ি দিয়ে কেউ একজন ঘুমিয়ে আছে। তাঁর শিয়রে বসে আবুজায়েদ কাকা, দুপাশে পান্ডবদাদা আর আতিকাকা। ওরা তিনজনই তো আমার আব্বার সর্বক্ষণের সাথি। তবে কি ওখানটায় আব্বাই শুয়ে? সেদিন সবার সেই গগনবিদারী হাহাকার আর কান্নার ধ্বনি সারাবেলা যেন আমারই অপেক্ষা করছিলো। শ্বেতবস্ত্রাবৃত ওই ঘুমন্তের দিকে চেয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। নোয়াকাকা বলে উঠলেন,

-আতিভাই বেলা যায়, কাপড় সরাও, ওরে মুখখান দেখাও। লাশ দাফন করতে হবে।

কাপড় সরাতেই দেখি আব্বা ঘুমিয়ে! শান্ত স্নিগ্ধ ঘুমন্ত, আমার আব্বা! আমি চেঁচিয়ে বললাম,

-দাফন করবেন কেন? আব্বা তো ঘুমাচ্ছে!

নোয়াকাকার ইশারায় দুএকজনে আমাকে পাঁজা কোলে তুলে ভেতর বাড়ীর উঠানে দাদীর সামনে নিয়ে ছাড়লো। আম্মা আর দাদী আমাকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না! আমি যেন সেদিন ওদের কান্নার ভাষা বুঝতে পেরেছিলাম। দাদী যেন বলছেন,

-আমার সব শেষ হইয়া গেল রে

আর আম্মার কান্নাধ্বনি যেন বলছিলো,

-তুইই এখন শেষ ভরসা রে বাবা!

এই যে শত স্বজনেরা এত যে কান্নাকাটি করছেন, কিন্তু আমি কাঁদছি না মোটেই। সেই মুহূর্তটি থেকে আজ অব্ধি আমার মনে হয় যে, মরা কান্নার থেকে অনেক বড় কর্তব্য আমার ঘাড়ে। আমি হাতপা ছেড়ে কাঁদতে বসলে কর্তব্য দেখবে কে? জীবনে যদি কখনও অবসর আসে, তখন না হয় মন ভরে কেঁদে নেবো।

ভেতর বাড়ীর উঠোনে তখন দশ গাঁয়ের মহিলাদের গিজগিজানো ভিড়! কতক্ষণ আম্মা আর দাদীর কাছে ছিলাম মনে নেই। কে যেন আমার একমাত্র ভাই দুমাসের আলভীকে আমার কোলে ছেড়ে দিলো। বড় বড় চোখে সে আমার দিকে তাকাছে, পলক ফেলছে না। হায়রে অভাগাটা, বুঝতেও পারছে না কি হারিয়েছে! সেই মুহুর্ত থেকে সারাজীবনের তরে ওকে বুকে জড়িয়ে নিলাম।

ওই ভিড়ের মধ্যে খুঁজছিলাম আমার বোন ৫টিকে। দেখি পুবের ঘরে কান্নাক্লান্ত ওরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপাচ্ছে। সেদিন সব স্বজনদের চোখেমুখে দেখেছিলাম শোকের ছায়া, আর বোন ক’টির মুখ জুড়ে দেখি আতঙ্ক! ঘটনার আকস্মিকতায় ওরা ভীত হয়ে পড়েছে। দেখতে পেয়েই ৫ জনে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

বুড়ি, চম্পা, কলি, সেলি, তুলি, আমার জীবনের ঐশ্বর্য ওরা। কাঁদছে আর বলছে,

-দাদু এখন আমাদের কি হবে?

আব্বার মৃত্যুর ক্ষণটিতেই ওরা বিপদ আঁচ করতে পেরেছে। আমাদের এখন কি হবে? এই মস্ত প্রশ্নটির কি জবাব দেবো আমি? নাকি গুরুতর সেই সংকটের স্বরূপ বোঝার উপযুক্ত বয়স তখন আমার? তবুও মনে সাহস রেখে দুহাতে ওদের চোখের জল মুছাতে মুছাতে বলেছিলাম সেদিন,

-ভয় কিসের? আমি আছি না?

(লেখক বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র নির্বাহী)

(রচনাটি টরন্টো’র আদি সংবাদপত্র “বাংলা কাগজ” -এর জন্য লিখিত। ফেসবুক-বন্ধুরা কেউ যদি পড়তে আগ্রহী হন, সেই চিন্তা থেকে কাগজ-কর্তৃপক্ষের সম্মতিতে লেখাটি আপলোড করলাম)

 

This Post Has 1,131 Comments

  1. AHvlhav

    In their original description of the syndrome, Liddle and colleagues demonstrated that aldosterone excess was not responsible for this disease and that, although spironolactone had no effect on the hypertension, patients did respond well to triamterene or dietary sodium restriction cialis online without Premenstrual syndrome evidence for symptom stability across cycles

  2. aANAutKg

    To disagree with someone does not mean you hate or fear them can you take viagra daily They found that fasting was able to protect against many of the cytotoxic effects without compromising the ability of the treatment to reduce tumor proliferation and burden 22 26

  3. kNQjiFiF

    procyclidine can you take aggrenox and plavix together There has also been much discussion about how GTAV treats women propecia uk Here are the clinical summaries that have been sent out so far

  4. Temp eMail

    There is definately a lot to find out about this subject. I like all the points you made

  5. Free Temp Mail

    This is really interesting, You’re a very skilled blogger. I’ve joined your feed and look forward to seeking more of your magnificent post. Also, I’ve shared your site in my social networks!

  6. Free Temp Mail

    I just like the helpful information you provide in your articles

  7. Timothynob

    3000mg prednisone: prednisone uk – prednisone cost in india

  8. MichaelGak

    can i buy generic clomid cost clomid pills – where to buy generic clomid prices

  9. Bruceencop

    buy misoprostol over the counter: buy cytotec pills – buy cytotec over the counter

  10. Marcoglade

    mexico drug stores pharmacies: mexican pharmacy – mexican rx online mexicopharm.com

  11. Marcoglade

    canadian drug stores: Canada Drugs Direct – certified canadian pharmacy canadapharm.life

  12. Marcoglade

    buying from online mexican pharmacy: Best pharmacy in Mexico – mexico pharmacies prescription drugs mexicopharm.com

  13. Marcoglade

    canadian pharmacy tampa: Canada Drugs Direct – canadian pharmacy prices canadapharm.life

  14. Marcoglade

    reputable indian pharmacies: Online India pharmacy – cheapest online pharmacy india indiapharm.llc

  15. MatthewtalrY

    п»їkamagra: buy kamagra – sildenafil oral jelly 100mg kamagra

  16. MatthewtalrY

    top rated ed pills: ed medications – best non prescription ed pills

  17. GreggPet

    can you get generic clomid without dr prescription: Buy Clomid online – buying cheap clomid

  18. MichaelLef

    cytotec online: buy cytotec – buy cytotec online

  19. MichaelLef

    cytotec buy online usa: cheap cytotec – buy cytotec online fast delivery

  20. WilliamAmout

    farmacie on line spedizione gratuita: kamagra gold – farmacie online autorizzate elenco

  21. Michaelglype

    acquistare farmaci senza ricetta: kamagra gel – farmacia online

  22. WilliamAmout

    п»їfarmacia online migliore: Tadalafil generico – farmacie online autorizzate elenco

  23. Michaelglype

    farmacia online migliore: kamagra gel – acquisto farmaci con ricetta

  24. Jaimerex

    medicine in mexico pharmacies: mexican pharmacy – mexico pharmacies prescription drugs

  25. Stevenfuh

    reputable indian online pharmacy: indianpharmacy com – top 10 online pharmacy in india

  26. Jaimerex

    п»їbest mexican online pharmacies: mexican rx online – pharmacies in mexico that ship to usa

  27. Frankthymn

    how to prevent hair loss while on tamoxifen: how to get nolvadex – who should take tamoxifen

  28. LarryHusty

    I’m always informed about potential medication interactions https://clomidpharm.shop/# can i get generic clomid without rx

  29. Frankthymn

    prednisone buy: online prednisone – can i buy prednisone online without a prescription

  30. Frankthymn

    cost of prednisone 10mg tablets: prednisone 60 mg tablet – can you buy prednisone over the counter in canada

  31. CharlesMIZ

    mexico drug stores pharmacies: Medicines Mexico – mexican drugstore online mexicanpharmacy.win

  32. CharlesMIZ

    vipps canadian pharmacy: Canada Pharmacy – canadian pharmacy near me canadianpharmacy.pro

  33. TimothywaG

    mexico pharmacy Mexico pharmacy buying from online mexican pharmacy mexicanpharmacy.win

  34. TimothywaG

    top 10 online pharmacy in india [url=http://indianpharmacy.shop/#]Order medicine from India to USA[/url] cheapest online pharmacy india indianpharmacy.shop

  35. TimothywaG

    buy medicines online in india indian pharmacy top 10 online pharmacy in india indianpharmacy.shop

  36. TimothywaG

    mexican drugstore online Mexico pharmacy reputable mexican pharmacies online mexicanpharmacy.win

  37. TimothywaG

    canadian pharmacy cheap Canada Pharmacy canada pharmacy online canadianpharmacy.pro

  38. TimothywaG

    india pharmacy mail order indian pharmacy reputable indian online pharmacy indianpharmacy.shop

  39. TimothywaG

    mexico pharmacy Medicines Mexico п»їbest mexican online pharmacies mexicanpharmacy.win

  40. RobertBob

    Pharmacie en ligne fiable achat kamagra Pharmacie en ligne livraison gratuite

  41. RobertBob

    Pharmacie en ligne livraison rapide PharmaDoc pharmacie ouverte 24/24

  42. VictorZew

    Pharmacie en ligne livraison rapide: kamagra pas cher – Pharmacie en ligne livraison rapide

  43. VictorZew

    Pharmacie en ligne sans ordonnance: Acheter Cialis – acheter medicament a l etranger sans ordonnance

  44. BreakReload

    I loved as much as you will receive carried out right here The sketch is attractive your authored material stylish nonetheless you command get got an impatience over that you wish be delivering the following unwell unquestionably come more formerly again since exactly the same nearly a lot often inside case you shield this hike

  45. RobertBob

    Acheter mГ©dicaments sans ordonnance sur internet Acheter Cialis Pharmacie en ligne fiable

  46. AaronSatry

    pharmacy cost of prednisone: prednisone coupon – can i buy prednisone online without prescription

  47. Ramonrix

    best online pharmacies in mexico: Online Mexican pharmacy – best online pharmacies in mexico mexicanpharm.shop

  48. TimothyPak

    reliable canadian pharmacy pharmacy in canada prescription drugs canada buy online canadianpharm.store

  49. pxhsspk

    I just could not depart your web site prior to suggesting that I really loved the usual info an individual supply in your visitors Is gonna be back regularly to check up on new posts

  50. CharlesClelo

    canadian pharmacy cheap: Canadian Pharmacy – buy canadian drugs canadianpharm.store

  51. CharlesClelo

    cheapest online pharmacy india: Indian pharmacy to USA – cheapest online pharmacy india indianpharm.store

  52. รับทำเว็บไซต์ผิดกฏหมาย ดูหนังโป๊ฟรี เราพร้อมให้บริการรับทำเว็บพนัน ครบวงจรจบในที่นี่ที่เดียวตอบโจทย์ทุกความต้องการงานคุณภาพในราคาย่อมเยาว์จ่ายจบไม่มีจุกจิกไม่มีบวกเพิ่มมีให้บริการทุกประเภทเกมเดิมพันเช่นกีฬาฟุตบอลคาสิโนบาคาร่าสล็อตยิงปลาและหวยเชื่อมต่อตรงค่ายเกมด้วยระบบAPIพร้อมทั้งออกแบบเว็บไซต์LandingPage,MemberPageและดีไซน์โลโก้ภาพโปรโมชั่นแถมVideoสำหรับโปรโมทพร้อมระบบหลังบ้านอัจฉริยะรวมถึงระบบฝาก-ถอนอัตโนมัติรวดเร็วบริการรับทำเว็บพนันที่มีให้คุณมากกว่าใครพร้อมฟีเจอร์มากมายที่คุณจะได้เมื่อทำเว็บพนันกับเรารับทำเว็บไซต์พนันเว็บพนันslotรับทำเว็บไซต์ผิดกฏหมายพนันคาบาร่าสลอตหวยของผิดกฏหมายหวยลาวดูหนังโป๊ฟรีเว็บไซต์ดูหนังโป๊ออนไลน์ยอดนิยมสามารถรับชมผ่านมือถือและคอมพิวเตอร์ได้หนังโป๊หนัง18+คลิปโป๊จากทั่วทุกมุมโลกมีทั้งหนังโป๊ไทยXXXPORNหนังเอวีJAVหนังโป๊เกาหลีหนังโป๊แนวซาดิสส์หีสวยๆเนียนๆและหมวดหนังเกย์คัดสรรแต่หนังโป๊ใหม่ๆและอัพเดทในทุกๆวันพร้อมคุณภาพความชัดและความเด็ดคัดโดยนักโพสที่มีความเงี่ยนและมืออาชีพขอบคุณและโปรดอย่าพลาดที่จะรับชมหนังโป๊ของเรารับเปิดเว็บพนันรวมค่ายเกมชื่อดังไว้ให้คุณ SAGaming,PGSLOT และอื่นๆอีกมากมายคาสิโนออนไลน์ฝากถอนไม่มีขั้นต่ำรองรับวอลเล็ทปลอดภัย100%คาสิโนออนไลน์ฝากถอนไม่มีขั้นต่ำเว็บตรงรองรับวอลเล็ทเล่นผ่านมือถือระบบออโต้100%สมาชิกง่ายไม่มีขั้นต่ำรวมเกมคาสิโนยอดนิยมมาตรฐานระดับสากลความปลอดภัยอันดับ1ผู้ให้คาสิโนเว็บตรงทำรายการฝากถอนได้อย่างสะดวกรวดเร็วทันใจรองรับการทำรายการกับธนาคารได้ครอบคลุมทุกสถาบันและยังรองรับการให้บริการแก่นักเดิมพันผ่านทางTrueMoneyWalletคาสิโนที่ดีทีสุด2024ทุกช่องทางที่เราเปิดให้บริการแก่นักลงทุนทุกท่านนั้นมีความสะดวกรวดเร็วในด้านการให้บริการในระดับสูงและยังกล้าการันตีความปลอดภัยในด้านการให้บริการเต็มร้อยคาสิโนออนไลน์นอกเหนือจากการเปิดให้บริการแบบไม่มีขั้นต่ำแล้วนั้นเว็บคาสิโนเรายังจัดเตรียมสิทธิประโยชน์และศูนย์รวมเว็บพนันออนไลน์ค่ายใหญ่ครองใจนักเดิมพันอย่างต่อเนื่องรับเปิดเว็บพนันออนไลน์ออกแบบเว็บไซต์คาสิโนออนไลน์ทุกรูปแบบพร้อมเชื่อมต่อค่ายเกมส์ดังด้วยAPIโดยตรงกับทางผู้ให้บริการเกมส์พร้อมเกมส์เดิมพันมากมายอาทิเว็บสล็อตเว็บเดิมพันกีฬาเว็บเดิมพนันE-Sportสามารถออกแบบเว็บพนันได้ตามสั่งลงตัวพร้อมระบบออโต้ฟังก์ชั่นล้ำสมัยใช้งานง่ายรวมผู้ให้บริการชั้นนำและค่ายเกมที่นิยมจากทั่วโลกพร้อมระบบจัดการหลังบ้านอัจฉริยะและทีมงานคอยซัพพอร์ทพร้อมให้บริการคุณตลอด24ชั่วโมง

  53. EugeneDoF

    best online pharmacy india indian pharmacy reputable indian pharmacies